থ্যালাসেমিয়া: লক্ষণ এবং প্রতিরোধ | oknews24 a leading online newsportal
Tuesday August 21, 2018

থ্যালাসেমিয়া: লক্ষণ এবং প্রতিরোধ

178 থ্যালাসেমিয়া: লক্ষণ এবং প্রতিরোধথ্যালাসেমিয়া সাংঘাতিক মানের রক্তস্বল্পতা রোগ। যেসব রোগীর স্বাভাবিক অবস্থায় মাথা ঘোরা, বসা থেকে উঠলে চোখে অন্ধকার দেখা, মুখে অরুচি, সর্বদাই মনমরা ভাব, ক্লান্তি বোধ ইত্যাদি থাকে, তাদের জানতে হবে যে, রক্তে লোহিত কণিকার অভাব বা ঘাটতি আছে।

একজন সুস্থ ও শক্তিশালী মানুষের রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ ৯% ভাগ। যা সংখ্যায় প্রতি ঘন মি.মি. রক্তে ৫০ লক্ষ থেকে ৬৫ লক্ষ পুরুষের বা, ৫–৬.৫ ঙ ১০১২/ এবং নারীদের ৩৮ লক্ষ থেকে ৫৮ লক্ষ/ঘন মি.মি বা, ৩.৮– ৫.৮ ঙ ১০১২/

যখন কারো শরীর ফ্যাকাশে দেখায় রোগীর অনুভুতিতে দুর্বলতা বোধ হয় তখন তাকে তার প্রতিবেশীরা বলে তার রক্তশুন্যতা হয়েছে। তখন তাকে শিং মাছ, কৈ মাছ (জাতীয় জিয়ল মাছ), টাটকা শাক–সবজি, দুধ, ডিম ইত্যাদি খেতে বলা হয়। তারা রোগীর রক্ত পরীক্ষা না করেই জেনে ফেলে তার রক্তশূন্যতা হয়েছে। একে বলা হয় লোহিত কণিকার ঘাটতি। অনেক জন্ডিস পরীক্ষায় দেখা যায় রক্তে থাকার কথা (৮%-৯%), কিন্তু (৪%-৬%) পাওয়া যায়।

থ্যালাসেমিয়া একটি জন্ম গত বা বংশগত রোগ। এটি একটি ল্যাটিন নাম। নামটি দুভাগ করে পাওয়া যায় ‘থ্যালাসা’ অর্থ সাগর এবং ‘মিয়া’ অর্থ রক্ত। চিকিৎসাক্ষেত্রে অতিরিক্ত রক্তের প্রয়োজন বলেই হয়তো এর নাম রক্তসাগর। থ্যালাসেমিয়ার প্রধান পরিচায়ক লক্ষণ হল–শিশুর রক্তে লোহিত কণিকা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ধ্বংস হতে শুরু করে ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।

কারণ জিনগত রোগ থ্যালাসেমিয়া। যদি বাবা ও মা দু’জনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন তবে তাদের সন্তানাদি থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হতে পারে। স্বাভাবিক রক্তের হিমোগ্লোবিনে মোট ৮ জোড়া জিনের মধ্যে

আলফা বিটা ও গামা বা ডেল্টা:
চেইন থাকে। যখনই কোন চেইনের ঘাটতি হয়, তখনই এই রোগের সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিক রক্তে আলফা ও বিটা চেইন থাকে ৯৭% এবং শিশুদের ক্ষেত্রে আলফা ও গামা চেইন থাকে = ৭০–৯০%. তিন প্রকার হিমোগ্লোবিনের মধ্যে অন্যতম হল ফিটাল হিমোগ্লোবিন। শিশুর জন্মের পর এক মাস বয়সে তা কমে ২৫ ভাগে দাঁড়ায় এবং ৬ মাস বয়সে তা নেমে আসে ৫% এ। ফিটাল হিমোগ্লোবিন হ্রাস পেয়ে এডাল্ট হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি পায় এবং তা ৯০–৯৫% এ উন্নীত হয়। এই যে পরিবর্তন তা সুস্থ শিশুতে দেখা যায়। কিন্তু কোন কারণে এর ব্যতিক্রম ঘটলে সৃষ্টি হয় থ্যালাসেমিয়া।

থ্যালাসেমিয়াকে সাধারণত দুইভাগে ভাগ করা হয়:

(১) আলফা থ্যালাসেমিয়া :
যখন জিনে আলফা চেইনের সিনথেসিস ঠিকমত হয় না তখন অতিরিক্ত পরিমাণে বিটা বা গামা চেইন তৈরি হওয়ার দরুন আলফা থ্যালাসেমিয়ার সৃষ্টি হয়।

(২) বিটা থ্যালাসেমিয়া:

যখন বিটা চেইনের সিনথেসিস ঠিকমত না হওয়ায় গামা বা ডেল্টা চেইন অতিরিক্ত তৈরি হয় তখন বিটা থ্যালাসেমিয়া রোগের সৃষ্টি হয়।

লক্ষণ :
(১) শিশুকাল থেকে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় এবং ক্রমশ: বৃদ্ধি পায়।
(২) অনেক সময় রক্তের লোহিতকণিকা অতি দ্রুত ভেঙ্গে গেলে হিমোলাইটিক জন্ডিস দেখা দেয়।
(৩) শরীরে সর্বদা দুর্বলতা ও অবসাদ থাকে এবং মুখমণ্ডল খুব ফ্যাকাশে দেখায়।
(৪) শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠিকমত হয় না।
(৫) লিভার ও প্লীহা বৃদ্ধি পায়। কখনও কখনও প্লীহা খুব বড় হয়।
(৬) অনেক সময় গালের হাড় খুব উঁচু হওয়ায় শিশুকে মঙ্গোলিয়ানদের মত দেখায়।
(৭) মাথার হাড় এবং অন্যান্য লম্বা হাড়ের একটা অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়।
(৮) অনেক সময় প্রচণ্ড রক্তস্বল্পতায় ভোগার দরুন হৃৎপিন্ড বৃদ্ধি পায় ও অনেক সময় কার্ডিয়াক ফেইলিওর হতে দেখা যায়।
(৯) লোহিত কণিকা অতি দ্রুত ভেঙ্গে যাওয়ার দরুন পিত্তপাথর তৈরি হয়ে যন্ত্রণা হতে পারে।
(১০) অনেক সময় নাক হতে রক্ত পড়ে।
(১১) অনেক সময় শরীরের চামড়ায় কালচে ভাব হয় ও পায়ে ঘা এর সৃষ্টি হয়।

থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়েছে কিনা জানবেন কীভাবে:

১। রক্ত পরীক্ষায় সিরাম বিলিরুবিন লেভেল খুব বেশি থাকে।
২। প্লাজমা হেপাটোগ্লোবিন লেভেল খুব কমে যায়।
৩। প্লাজমা হিমোপেক্সিন লেভেল কমে যায়।
৪। প্লাজমা ফ্রি–হিমোগ্লোবিন, মেথেম এলবুমিন লেভেল বেড়ে যায়।
৫। প্রস্রাবে ইউরো বিলিনোজেন এবং মলে স্টারকো বিলিনোজেন লেভেল বেড়ে যায়।
৬। পেরিফেরাল রক্ত পরীক্ষায় লোহিত কণিকার সংখ্যা কমে যায় এবং রেটিকিউলোসাইটের সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। রক্তে সিকেল সেল, স্ফেরোসাইট , এলিপটোসাইট ও টার্গেট সেল (কটরথণফ উণফফ) ইত্যাদি পাওয়া যায়।
৭। বোন ম্যারো পরীক্ষায় দেখা যায় এরিথ্রয়েড হাইপারপ্লাসিয়া।
৮। মাথার হাড়ের ডিপ্লোয়িক স্পেস বৃদ্ধি পায় ও বনি ট্রেবিকিউলি অনেক সময় দেখতে পাওয়া যায়। লম্বা হাড়ের ভেতরের গর্ত চওড়া হয়ে যায়। রোগ নিরুপনের জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। তাছাড়া মাথার খুলির এক্স–রে ও করা হয়।
৯। রেডিও এ্যাকটিভ ক্রেমিয়াম পরীক্ষার দ্বারা জানা যায় এর লাইফ স্প্যান কত। ১০। পেপার–ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষার দ্বারা জানা যায় হিমোগ্লোবিন পিকের অস্বাভাবিকতা।

মনো–দর্শন:
চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রতিটি ঔষধ কমপক্ষে ১০/১২টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ কয়েক হাজার প্রকাশিত লক্ষণ সমষ্টির উপর পরীক্ষিত হয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এগুলি এত সব মানুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার উপলব্ধি যে, মিথ্যা বলে দূরে ঠেলার বা অবজ্ঞা করার কোনও সুযোগ নেই। কারণ কোনও ওষুধকে প্যাথলজির টেস্ট ল্যাব থেকে বাস্তব সমাজ জীবনে আনতে হলে অনেক অবস্থার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। তারপর আবার চিকিৎসক নিজে প্রুভিং করেন, রোগীকে দেন, ফলাফল যাচাই করে একটা র্ওলভঢটরঢ অবস্থানে ওষুধগুলো আসে। আগামী দিনে কোন্‌ কোন্‌ লক্ষণ সমষ্টি নিয়ে কোন্‌ কোন্‌ নামের রোগ আসবে তা বহু পূর্বেই পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হয়েছে। এখন আমাদের কর্তব্য হল চিকিৎসাক্ষেত্রে উপস্থিত রোগীর লক্ষণ সমষ্টি পর্যবেক্ষণ পূর্বক যথাযথ ওষুধের প্রতিবিধান করা।

যেমন ধরুন কোন রোগী বলছে আমার শরীর অবশ ভাব, হাতে পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরা, মাথা ঘোরা, শরীর ভারীবোধ তাকে দেখতে লাগছে ফ্যাকাশে, ঘুম থেকে দেরীতে ওঠে সারাদিন ক্লান্তি ভাব, শরীর মোটা থলথলে, পাল্‌স পাওয়া যায় না, সর্বদাই ঝিমুনি ব্যারাম চিন্তায় ধীর গতি (চায়না, ক্যাল্কেরিয়া কার্ব, সিপিয়া) ইত্যাদি।

চিকিৎসা:
চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রথম নিয়ম হল, একসঙ্গে একটি মাত্র ওষুধ পরিবর্তনশীল শক্তিতে প্রয়োজ্য। অর্থাৎ পরিমাণে অল্প, শক্তিতে উচ্চ এবং প্রয়োগে লঘু। এক্ষেত্রে কি কি ওষুধ আসতে পারে তা বিনা বর্ণনায় উল্লেখ করছি। কিন্তু একথা চিরস্মরণীয়–কারণ বিনা যেমন কার্য্য হয় না তেমনি তিন থেকে চারটি মৌলিক ও একটি অদ্ভুত লক্ষণ না দেখে মনগড়া কোন ওষুধ রেপার্টোরাইজ করলে রোগী আরোগ্য লাভ করবে না। এ মারাত্মক ভুলের কারণে যদি রোগ দীর্ঘস্থায়ী রূপ লাভ করে তার জন্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিদ্যাকে ভূল বোঝার কোন অবকাশ নেই।

ওষুধ:
চায়না, ফেরাম মেট, ক্যাল–কার্ব, ক্যাল–আর্স, সিয়োন্যান্থাস, সিয়ানোথাস, ক্যাল–ফ্লোর, সিম্ফাইটাম ক্যাল–ফস, ক্যাক্টাস, কোলেস্টেরিন, মার্ক–কর, মিলিফোলিয়াম, ট্রিলিয়াম, এইল্যান্থাস, ক্যালোট্রপিস, হিপার, হাইড্রোকোটাইল, আর্টিকা, লেপট্যান্ড্রা, আর্স–এলবা, ন্যাট্রাম–মিউর, ন্যাট্রাম–কার্ব, ক্রোটেলাস হরি, ইল্যাপস, ল্যাকেসিস, ন্যাট্রাম–সালফ, কাল মেঘ, র্কাবোভেজ, চেলিডোনিয়াম, রাস–টক্স ইত্যাদি।

প্রয়োজন হলে কনস্টিটিউশনাল চিকিৎসা করাতে হবে।

পরামর্শ:
যখন কোন যুবক যুবতী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন তার আগে তাঁরা দুজনেই বা যে কোনো একজন স্থানীয় থ্যালাসেমিয়ার পরামর্শ কেন্দ্রে গিয়ে রক্তের পেপার ইলেকট্রোফোরোসিস পরীক্ষার মাধ্যমে অবশ্যই জানবেন যে তারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। যদি পাত্র/পাত্রীর যে কোন একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন তবে তাদের অনাগত সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কম। (সংগৃহীত)

Filed in: লাইফ স্টাইল